উপমহাদেশের সুপরিচিত,জনপ্রিয় কবি ও কথা-সাহিত্যিক মাধুরী ব্যানার্জীর লেখা অণুগল্প : “সঠিক ঠিকানা”
Posted By :
bdpratinioto
আগস্ট ১, ২০২৬
ময়মনসিংহ বিভাগ, সারাদেশ
4 Views
সঠিক ঠিকানা মাধুরী ব্যানার্জী: ডাকপিয়ন রতনবাবুর চাকরি জীবনের শেষ সপ্তাহ চলছিল। চার দশক ধরে তিনি হাজার হাজার চিঠি মানুষের হাতে তুলে দিয়েছেন। কারও কাছে সুখবর, কারও কাছে চাকরির নিয়োগপত্র, কারও কাছে আবার প্রিয়জনের শেষ খবর।সেদিন ডাকঘরের এক কোণে ধুলো জমা একটি পুরোনো খাম তাঁর চোখে পড়ল। খামের ওপর শুধু লেখা—”যার হৃদয়ে এখনো মায়া বেঁচে আছে, তার হাতে পৌঁছে দেবেন।
কোনো বাড়ি নম্বর নেই, কোনো গ্রামের নাম নেই। সহকর্মীরা হেসে বলল, — “এ আবার কোনো ঠিকানা হলো নাকি?”
রতনবাবু খামটি ফেলে দিতে পারলেন না। অদ্ভুত এক টান অনুভব করলেন। বাড়ি ফেরার পথে তিনি দেখলেন, রাস্তার ধারে এক বৃদ্ধা ক্ষুধার্ত অবস্থায় বসে আছেন। তিনি নিজের টিফিনের বাক্সটি বৃদ্ধার হাতে তুলে দিলেন। বৃদ্ধার চোখে জল এসে গেল।আরও কিছুদূর এগোতেই এক ছোট ছেলে কাঁদছে। স্কুলের ব্যাগ ছিঁড়ে বইগুলো রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে। রতনবাবু ব্যাগটি সেলাই করিয়ে দিলেন, বইগুলো গুছিয়ে দিলেন। ছেলেটি হেসে বলল, — “দাদু, আপনি খুব ভালো মানুষ।সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তিনি কৌতূহল সামলাতে না পেরে খামটি খুললেন। ভেতরে ছিল মাত্র একটি ছোট্ট কাগজ।

তাতে লেখা অভিনন্দন। বহুদিন ধরে এই চিঠির সঠিক ঠিকানা খুঁজছিলাম। আজ অবশেষে পেলাম। মানুষের আসল ঠিকানা তার বাড়ি নয়, হৃদয়। যদি এই চিঠি আপনার হাতে এসে থাকে, তবে বুঝবেন— আপনার হৃদয়ই তার সঠিক ঠিকানা।রতনবাবুর চোখ ভিজে উঠল। জীবনে তিনি কত ঠিকানায় চিঠি পৌঁছে দিয়েছেন, অথচ আজ বুঝলেন— সবচেয়ে কঠিন ঠিকানা ছিল মানুষের হৃদয়।পরদিন অবসর গ্রহণের অনুষ্ঠানে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, — “আপনার দীর্ঘ জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?”মৃদু হেসে তিনি বললেন, — “বাড়ির নম্বর ভুল হতে পারে, গ্রামের নাম বদলে যেতে পারে, রাস্তার মোড়ও একদিন হারিয়ে যায়। কিন্তু ভালোবাসা, সহানুভূতি আর মানবতার যে হৃদয়— সেটাই পৃথিবীর একমাত্র সঠিক ঠিকানা।”সেদিন উপস্থিত সবাই করতালি দিয়েছিল। কেউ জানত না, একটি নামহীন চিঠিই একজন ডাকপিয়নকে জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য শিখিয়ে দিয়েছে।মানুষের পরিচয় তার সম্পদ, পদবি বা ঠিকানায় নয়; তার আচরণ, মমতা ও মানবিকতাই তার প্রকৃত এবং সঠিক ঠিকানা।
২০২৬-০৮-০১